রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০০৯

কানুভট্ট'র মৃত্যু পরবর্তী সঙবাদ বিজ্ঞপ্তি

কানুভট্ট পুত্রকর্মশোকে আত্মা বিসর্জন দিয়েছেন। ১২ অক্টোবর বিকেলে পুকুর পাড়ে বিষপান শেষে হাসপাতালে নেয়ার পথে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৫৫বছর। এসময় তিনি তার স্ত্রী দু'ছেলে এক মেয়ে, বৃদ্ধা মা আর অনেকগুলো ভাই-ভাইয়ের বৌ, পোলা মাইয়া রেখে যান। অপমৃত্যু বলে অপরাপর ব্যক্তিবর্গ তার স্বজন হওয়ার দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। কানুভট্টের স্বাভাবিক মৃত্যুর কিছুদিন আগে এই অমস্মাৎ বিদায়ে গ্রামের বিশিষ্টজনরা সতর্কভাবে শোকবানী দিয়েছেন। মৃত্যুখবর শুনে অনেক মুসলমান ইন্নালিল্লাহ পড়লেও পরে হিন্দু আবিষ্কারের পর দু'গালে থাপ্পড় মেরেছেন এবং তওবা করেছেন।

গ্রামে এ সংক্রান্ত আলোচনা আজ দু'দিন। মু'দি দোকানগুলোয় চাপাতা, চিনি আর কনডেন্সড মিল্কের কাটতি ভালো। এর আগে নবী এবং তুলসী দেবী প্রেমসহ নীল হয়েছিলো। মানুষের আলোচনায় আরো উঠে এলো ক্ষুদিরামের বোন। অপমৃত্যু বলে অধিকাংশ ধর্মীয় আচারমুক্ত ভট্ট পরিবারে ছোট মেয়েটা দু'দিন আর নুপুর পরে না। আরো ছোট ছিলো সে- একদিন ঈদের বাজারে টুপি কেনার জেদ ধরেছিলো। মহাপাপী কানু সেদিন ধর্মের ধোহাই দিয়ে রেহাই পেয়েছিলো। কানুর অর্ধবৃদ্ধা স্ত্রী মোট দু'বার মাথা ঘুরে পড়েছে। আর অনেক বিলাপ করেছে। ছোট ছেলের নাম রাজন। পলিটেকনিক্যালের পড়া হয়তো শেষ। কিন্তু শুরুও নিশ্চয় কিছু একটা হবে। হোক, আরেক মৃত্যু অথবা অগণিত মৃত্যু শুরু হোক।

অঞ্জন আর জয়- আমার সহকর্মী। কানু'র দাহকর্মে গিয়ে ফিরে আসলো। পুলিশ এখনো ছাড়েনি। কলিজা গুদ্দা সব নেয়া হয়নি বলে পোড়ানো হয়নি। মৃত মানুষ পুড়িয়ে ফেলা বা মাটিচাপা দেয়া আমার ভালো লাগে না। শক্তিহীন কাউকে এমন শাস্তি দেয়ার মাঝে কোন বীরত্ব নেই। আগুনের চীৎকার আর মাটিচাপা ধড়পড়; আহা! জীবনসুখের কামভোগ। হীরন্ময় আর পংকজ তাদের আত্মহত্যা চেষ্টার স্মৃতিচারণ করলো। পরিকল্পনা ভালো ছিলো। হীরন্ময় চেয়েছিলো পেটে ছুরি চালান করতে আর পংকজ রেলে কাটা পড়তে। পরিশেষে হীরন্ময়ের পেটে ১২টি সেলাই পড়লো। পংকজের সে রাতের রেল আসেনি। কিন্তু এরপর অনেকদিন ধরেই নিয়মিত রেল এসেছিলো এবং পরের বৈশাখী মেলায় আরো ধারালো ছুরি উঠেছিলো। আশ্চর্য! আর নতুন সেলাই পড়েনি, অঞ্জন আর জয়ও পূণ্যকর্মে ছুটেনি।

মনে আছে দু'বারের কথা। একবার ৫তলা দালানের ছাদ আরেকবার ৪০টা ঘুমের বড়ি। দু'বারই ব্যর্থ! লজ্জা আর লজ্জা। আমার জীবন, আমার দেহ। পারি না, পুরোপুরি অধিকার খাটাতে পারি না। কানু ভট্টকে নমষ্কার। জীবনের প্রতি এমন অধিকার খাটাতে ক'জন পারে! হীরন্ময়, পংকজ কিংবা আমি; এরকম অনেকেই পারেনি।

মৃত্যুর আগে কানু'র শরীরে দেবতারা অসূরের শক্তি আর কালীর সাহস আপলোড করেছেন। কানু'র চোখ থেকে মুছে দিয়েছেন ছোট মেয়েটার ছোট ছোট দাঁত। গোল গাল গোস্বা ভুলে কানু হারিয়ে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। তাদের বাড়ির উপেরর আকাশটা রং বদলায়নি। পুকুর পাড়ে কোন স্বর্গ বা নরক সৃষ্টি হয়নি। তুবও কানু মরে যাবার বিষয়ে একক সিদ্ধান্তে আসতে পারলেন। মৃত্যুর সময় সাহায্য করেছিলো তার বড়ো ছেলের অপকর্ম। আর বড়ো একটি সালিশ। অবশ্য ছোট দু' ভাইয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যতও কিছুটা অবদান রেখেছে। যমদূতের অপেক্ষা ছিলো শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত। মৃত্যু টুকে নিয়ে তারা ঈশ্বরের কাছে চলে গেলেন।

শোকটা পুত্রকর্মে। কমতো নয় ১২ লাখ টাকার কেলেংকারি। যদিও গ্রামের সবচে' লম্বা ঘরের মালিক ভট্ট পরিবার। তবুও ঘর বিক্রির টাকায় দেনা শোধ হবে না। গ্রামের সব পিতার সচেতন হবার কথা শুনি। পুত্রদের খোঁচা দেয়ার ব্যাথা পাই। নারীদের গর্ভে থাকা সকল পুত্রের বিলম্ব প্রসব টের পাই। পিতারা এখন শংকিত, আতংকিত। কিন্তু একটা খবর জানা যায়নি, বিকেলে কানুর মৃত্যুখবরের রাতে কতোজন পিতা স্ত্রী সংগমে বিরতি নিয়েছিলেন। আসলে সে রাতের কামকর্মে কতোটুকু আরাম ছিলো? আমার ঘরে কোন স্ত্রী নেই। আমিই বা কি করতাম? পুত্রকর্মশোক আমাকে কতোবড়ো পিতা বানাতো?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন